কুমিল্লায় জন্মভূমিতে শচীনকর্তার স্মৃতিবাড়ি অবহেলায়
বছরের বেশির ভাগ সময় রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় মেলায়ই সীমিত পরিচর্যা
কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি · কুমিল্লা
প্রকাশ:
শচীন দেববর্মনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার থেকে কুমিল্লায় দুই দিনব্যাপী ‘শচীন মেলা‑২০২৬’ শুরু হয়েছে। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে দক্ষিণ চর্তার পৈতৃক বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমিল্লা‑৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক রোজী আকতার, যার সভাপতিত্বে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। শনিবার কুইজ প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা মেলার সমাপনী হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়।
বিজ্ঞাপন
শচীন দেববর্মন ১৯০৫ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা দক্ষিণ চর্তায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর মুম্বাই, ভারততে মৃত্যুবরণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি দক্ষিণ চর্তায় অবস্থিত, যা বছরের দু-একবার মেলা সময়ই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হলেও বাকি সময়ে অবহেলায় থাকে।
কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর প্রথম আলোকে জানান, "কুমিল্লার নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটিতে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে শুধু আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে কার্যকর কিছু হয়নি।" তিনি যোগ করেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে মেলা সময় বাড়ি পরিষ্কার করা হয়, তবে অধিকাংশ সময় অরক্ষিত থাকে এবং কখনো কখনো মাদকসেবীদের উপস্থিতি দেখা যায়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটির দেখভালে অস্থায়ী পাহারাদার থাকলেও নিয়মিত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক, ঐতিহ্য কুমিল্লার, বলেন, "সংস্কারের পর বাড়িটিতে শচীন কমপ্লেক্স করার কথা ছিল; কিন্তু এত বছরেও তা হয়নি। ফলে বাড়িটি আবারও পরিত্যক্ত অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।" তিনি যোগ করেন, ২০১৪ সাল থেকে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’ বাড়ির সংরক্ষণ দাবি করে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়; এক সময় এর বড় অংশ দখল করে সরকারি মুরগির খামার গড়ে তোলা হয়। সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবিতে ২০১৪ সালে বাড়ির একাংশ উদ্ধার করা হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালে সংস্কার কাজ শেষ হয়, তবে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়ির অবস্থা আবারো খারাপ হয়েছে এবং বেশ কিছু মালামাল চুরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
শচীন দেববর্মনের বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেব ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান ও সংগীতশিল্পী ছিলেন; দক্ষিণ চর্তায় শচীন তার শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন। ১৯২৪ সালে তিনি কুমিল্লা ছেড়ে কলকাতায় যান এবং পরে মুম্বাইয়ে বসবাস করে চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে পরিচিত হন। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করে। তাঁর স্ত্রী মীরা দেবীও উপমহাদেশের অন্যতম গায়িকা ও গীতিকার ছিলেন। একমাত্র পুত্র রাহুল দেববর্মন (আর ডি বর্মন) এবং পুত্রবধূ আশা ভোসলে তার পরিবারে নামকরা শিল্পী।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজিব মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, "এ ছাড়া সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীরা তাঁকে নিয়ে সংগীত পরিবেশন করেন।" তিনি উল্লেখ করেন, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ কাজের দায়িত্ব বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওপর।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান বাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। এটি সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে তাঁরা কাজ করবেন। এখানে শচীন দেববর্মনের সৃষ্টি নিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরির জন্য সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাড়িটির সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান ফটক সংস্কারের চেষ্টা চলছে।"