বিদ্যুৎ‑পানি বন্ধ, উচ্ছেদ‑আতঙ্কের মধ্যে দিল্লির শতবর্ষী মসজিদে মুসল্লিরা জুমা নামাজ পড়লেন
উচ্ছেদ‑নোটিশের পরেও মুসল্লারা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নামাজ সম্পন্ন করেছেন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত শতাব্দীপ্রাচীন রেসকোর্স মসজিদে শুক্রবার জুমা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়, যদিও প্রশাসনের উচ্ছেদ‑আতঙ্ক, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু ছিল। মসজিদটি চারপাশের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে সাধারণ মুসল্লিরা সমবেত হন।
বিজ্ঞাপন
নামাজ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও উপস্থিত মুসল্লিদের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা গিয়েছে; তারা অভিযোগ করেন যে প্রশাসন পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে।
স্থানীয় প্রশাসন রেসকোর্স মসজিদকে অবৈধ ঘোষণা করে উচ্ছেদের নোটিশ জারি করেছে এবং নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার আগেই মসজিদসংলগ্ন এলাকায় বুলডোজার চালিয়ে বেশ কিছু বসতবাড়ি ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, ফলে বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই ধরণের অবৈধ দখলের অভিযোগ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়ও উঠে এসেছে, যেখানে মূলত বাংলাভাষী মুসলিমদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শুক্রবার ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা জারি করা হয়, যার ফলে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির জমায়েত এবং যেকোনো ধরনের বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। তবে জুমা নামাজের নির্ধারিত সময়ে পুলিশ কিছুটা নমনীয় হয়ে মুসল্লিদের মসজিদে প্রবেশ ও নামাজ আদায়ের অনুমতি দেয়।
নামাজ শেষে আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা আমানতউল্লাহ খান দাবি করেন, দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ড, এনডিএমসি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং ঐতিহাসিক মসজিদটি পুরোপুরি সুরক্ষিত রয়েছে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন। স্থানীয় মুসল্লি ও তাঁদের সমর্থকরা মসজিদে নামাজ পড়তে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান হবে বলে আশা করছেন।
বিজ্ঞাপন
তবে উপস্থিত অনেক মুসল্লি তাঁদের ক্ষোভ গোপন করেননি; বিহার থেকে আসা আশরাফুল খান বলেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায় হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমদেরই বেছে বেছে নিশানা করা হচ্ছে। একই অভিযোগ তুলে আমানুল্লাহ নামের এক যুবক বলেন, “এর চেয়ে বরং সরকার সরাসরি বলে দিক যে মুসলিমরা এ দেশে অবাঞ্ছিত। তাদের জন্য প্রশাসনের কোনো সহমর্মিতা নেই।”
পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ও দিল্লিতে কর্মরত বাগান পরিচর্যাকারী মইদুল আলম বর্ণনা করেন, “আলো নেই, পানি নেই, পাশে শুধু ভগ্নস্তূপ। মসজিদ চত্বরে যেন আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমাদের নামাজ পড়ানোর সময় ইমাম সাহেবের চোখে পানি এসে গিয়েছিল। আমরা সকলেই তা দেখে খুবই বিষণ্ন হয়ে পড়েছি।”
৭ অক্টোবর মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ১৫ অক্টোবর দিল্লি হাইকোর্টে সংযোগ পুনর্বহালের আবেদন জানানো হলে আদালত তা খারিজ করে, কারণ ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তর ওই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে দিলে জননিরাপত্তার ঝুঁকি হতে পারে। এই আদেশের পর থেকে আধা‑সামরিক বাহিনী ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
মসজিদের ইমাম মৌলভি হারুনের অভিযোগ, ১৭ অক্টোবর ভূমি ও উন্নয়ন দপ্তরের এক কর্মকর্তা তাঁকে মাত্র ছয় দিনের মধ্যে মসজিদ খালি করে দেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন। ইমাম দাবি করেন, মসজিদটি ওয়াক্ফ তালিকাভুক্ত নিবন্ধিত সম্পত্তি এবং এর সপক্ষে বৈধ কাগজপত্র রয়েছে; পরিষেবা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে তাঁরা জেনারেটর চালিয়ে কার্যক্রম সচল রেখেছেন।
বিজ্ঞাপন
সরকারি সূত্রের দাবি, মসজিদ কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং দিল্লি ওয়াক্ফ বোর্ড কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় এনডিএমসির কাছে লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তবে আদালত জানিয়েছেন, মসজিদের ইমাম ব্যক্তিগতভাবে রিট করার আইনি অধিকার (লোকাস স্ট্যান্ডাই) রাখেন না এবং ওয়াক্ফ বোর্ড সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হয়নি।