ঢাকা থেকে কলকাতা যাওয়ার উপায়: বাস, ট্রেন ও বিমানের তুলনা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব খুব বেশি নয়, কিন্তু কোন পথে যাবেন তার ওপর নির্ভর করে যাত্রাটা হতে পারে এক ঘণ্টার, আবার আধা দিনেরও। বাসে গেলে খরচ কম, সীমান্তে হেঁটে পার হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়। বিমানে দ্রুত, তবে খরচ বেশি। আর ট্রেনে আরাম আর একই জায়গায় ইমিগ্রেশনের সুবিধা ছিল, যদিও সেই সেবা দীর্ঘদিন বন্ধ।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা থেকে কলকাতা যাওয়ার উপায় হিসেবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে বাসযাত্রা। পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বেনাপোল যাওয়ার সময় অনেক কমেছে, তাই সরাসরি বাসে সারা দিনেই বা রাতের মধ্যে কলকাতা পৌঁছানো যায়। যাঁদের সময় কম বা বয়স্ক যাত্রী সঙ্গে আছেন, তাঁদের জন্য বিমানই সুবিধাজনক।
যে পথেই যান, ভারতীয় ভিসায় সেই পথ উল্লেখ থাকতে হবে। বাসে গেলে ভিসায় সড়কপথ ও বেনাপোল-পেট্রাপোল, বিমানে গেলে বিমানপথ। এটা মিলিয়ে না নিলে সীমান্তে ফিরে আসতে হতে পারে।
বাসে: ঢাকা কলকাতা বাস
ঢাকা থেকে কলকাতা পর্যন্ত সরাসরি বাস সেবা দেয় কয়েকটি বেসরকারি পরিবহন সংস্থা, আর দুই দেশের সরকারি পরিবহন সংস্থার যৌথ সেবাও চালু ছিল। বাস ছাড়ে সাধারণত কমলাপুর, আরামবাগ, কলাবাগান বা কল্যাণপুর এলাকার কাউন্টার থেকে।
বিজ্ঞাপন
১. যাত্রাপথ: ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোরের বেনাপোল। সেখানে যাত্রীরা নেমে ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস শেষ করে হেঁটে সীমান্ত পার হন। ওপারে পেট্রাপোলে ভারতের ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস। এরপর একই সংস্থার ভারতীয় অংশের বাসে কলকাতা।
২. সময়: সীমান্তে ভিড়ের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। সব মিলিয়ে মোটামুটি দশ থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা ধরে রাখুন। ঈদ বা পূজার আগে-পরে সীমান্তে কয়েক ঘণ্টা বাড়তি লাগতে পারে।
৩. ভাড়া: এসি বাসে এক দিকে আনুমানিক ২০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, সংস্থা ও আসনের ধরনভেদে। নন-এসি তুলনামূলক কম। এর সঙ্গে ভ্রমণ কর ও বন্দর ফি আলাদা।
৪. সুবিধা: বাস সংস্থার কর্মীরা সীমান্তে সাধারণত যাত্রীদের পথ দেখিয়ে দেন, ব্যাগ বহনে সহায়তা করেন।
বিজ্ঞাপন
বাস বদলে কম খরচে: বেনাপোল দিয়ে কলকাতা
আরও কম খরচে যেতে চাইলে সরাসরি বাসের বদলে ভাগে ভাগে যাওয়া যায়।
১. ঢাকা থেকে বেনাপোলের বাসে সীমান্ত পর্যন্ত।
২. হেঁটে সীমান্ত পার হয়ে পেট্রাপোল।
বিজ্ঞাপন
৩. পেট্রাপোল থেকে অটো বা ভ্যানে বনগাঁ রেলস্টেশন, অল্প সময়ের পথ।
৪. বনগাঁ থেকে লোকাল ট্রেনে কলকাতার শিয়ালদহ, দুই ঘণ্টার মতো, ভাড়া খুবই কম।
এই পথে খরচ সবচেয়ে কম, কিন্তু লোকাল ট্রেনে ভিড় বেশি থাকে, ভারী ব্যাগ নিয়ে কষ্ট হয়। প্রথমবার যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য সরাসরি বাসই সহজ।
ট্রেনে: মৈত্রী এক্সপ্রেস
বিজ্ঞাপন
মৈত্রী এক্সপ্রেস ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে কলকাতার চিৎপুর স্টেশন পর্যন্ত চলত। এর বড় সুবিধা ছিল যাত্রার শুরু ও শেষের স্টেশনেই ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস হয়ে যাওয়া, পথে সীমান্তে নামতে হতো না। খুলনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত বন্ধন এক্সপ্রেসও চলত।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে এই ট্রেনগুলো বন্ধ রয়েছে। ২০২৬ সালে দুই দেশের রেল কর্মকর্তাদের বৈঠকে আবার চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, এমনকি পদ্মা সেতু হয়ে নতুন পথে চালানোর প্রস্তাবও এসেছে, যাতে সময় কয়েক ঘণ্টা কমতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক চালুর ঘোষণা আসার আগে এ পথে পরিকল্পনা করা ঠিক হবে না। যাত্রার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঘোষণা দেখে নিন।
ট্রেন চালু হলে টিকিট সাধারণত কমলাপুর বা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে পাসপোর্ট দেখিয়ে কাটতে হয়। ভিসায় রেলপথ বা সংশ্লিষ্ট স্টেশনের উল্লেখ লাগবে।
বিমানে: দ্রুততম পথ
বিজ্ঞাপন
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশি ও ভারতীয় কয়েকটি বিমান সংস্থার ফ্লাইট চলে। উড়ানের সময় এক ঘণ্টার কম। বিমানবন্দরে আগে পৌঁছানোসহ সব মিলিয়ে চার-পাঁচ ঘণ্টায় কলকাতার হোটেলে পৌঁছানো সম্ভব।
আসা-যাওয়ার ভাড়া মৌসুম ও বুকিংয়ের সময়ভেদে আনুমানিক ১২০০০ থেকে ২৫০০০ টাকা বা তার বেশি। আগে কাটলে সস্তা পাওয়া যায়। বিমানে ভ্রমণ কর সাধারণত টিকিটের দামের সঙ্গেই থাকে। ভিসায় বিমানপথ উল্লেখ থাকতে হবে।
তুলনা: কোন পথ কার জন্য
খরচ: বেনাপোল হয়ে লোকাল ট্রেন সবচেয়ে সস্তা, তারপর সরাসরি বাস, সবচেয়ে বেশি বিমান।
বিজ্ঞাপন
সময়: বিমান সবচেয়ে দ্রুত। বাসে দিনের বড় অংশ চলে যায়।
আরাম: বিমান ও ট্রেনে আরাম বেশি। বাসে সীমান্তে ব্যাগ নিয়ে হাঁটা ও লাইনে দাঁড়াতে হয়।
কার জন্য কোনটা: শিক্ষার্থী ও বাজেট ভ্রমণকারীর জন্য বাস, বয়স্ক বা রোগী সঙ্গে থাকলে বিমান, আর ট্রেন চালু হলে পরিবার নিয়ে আরামে যাওয়ার জন্য মৈত্রী।
সীমান্তে যে কাজগুলো করতে হয়
বিজ্ঞাপন
১. ভ্রমণ কর: স্থলপথে বর্তমানে প্রায় এক হাজার টাকা। সোনালী ব্যাংকের বুথে বা অনলাইনে আগেই পরিশোধ করা যায়। রসিদ সঙ্গে রাখুন।
২. বন্দর ফি: বেনাপোল স্থলবন্দরে যাত্রীপ্রতি সামান্য সেবা ফি দিতে হয়।
৩. বাংলাদেশ অংশ: ইমিগ্রেশন ফরম, পাসপোর্টে বহির্গমন সিল, কাস্টমসে ব্যাগ পরীক্ষা।
৪. ভারত অংশ: আগমন ফরম পূরণ, ইমিগ্রেশনে সিল, কাস্টমস।
বিজ্ঞাপন
৫. টাকা ভাঙানো: সীমান্তের অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জে অল্প রুপি নিয়ে নিন, বাকিটা কলকাতার নিউমার্কেট বা মারকুইস স্ট্রিট এলাকার অনুমোদিত দোকানে, যেখানে হার তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায় বলে অনেকে মনে করেন।
সীমান্তে দালাল এড়িয়ে চলুন। নিজে কাউন্টারে গিয়ে কাজ করুন, কোনো কাজের জন্য অতিরিক্ত টাকা চাইলে কর্তৃপক্ষকে জানান।
ব্যাগ ও কাগজপত্রের চেকলিস্ট
সীমান্তে বারবার ব্যাগ খোলা আর কাগজ বের করার ঝামেলা কমাতে আগে থেকে গুছিয়ে নিন। একটি ছোট ফাইল বা জিপ ব্যাগে পাসপোর্ট, ভিসার পাতার ফটোকপি, ভ্রমণ করের রসিদ, ডলার এনডোর্সমেন্টের কাগজ, হোটেল বুকিংয়ের প্রিন্ট আর দুই কপি ছবি রাখুন। জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিও সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ব্যাগ যত হালকা হবে, সীমান্তে হাঁটা তত সহজ। চাকাওয়ালা একটি মাঝারি স্যুটকেস আর একটি ছোট পিঠের ব্যাগ যথেষ্ট। মূল্যবান জিনিস, ওষুধ আর এক সেট পোশাক হাতের ব্যাগে রাখুন। কাস্টমসে ঘোষণাযোগ্য কিছু থাকলে, যেমন দামি ইলেকট্রনিক পণ্য বা নির্দিষ্ট সীমার বেশি নগদ বৈদেশিক মুদ্রা, তা ঘোষণা করুন। খাবার, বিশেষ করে মাংস বা ফল নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকতে পারে।
কলকাতায় পৌঁছে প্রথম দিনের জন্য কিছু রুপি হাতে রাখুন, কারণ ট্যাক্সি বা অটোতে সাধারণত নগদে ভাড়া দিতে হয়। মোবাইল সিম কেনার জন্য পাসপোর্ট ও ভিসার কপি এবং ছবি লাগবে, তাই কপিগুলো হাতের কাছে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঢাকা থেকে কলকাতা বাসে কত সময় লাগে?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত দশ থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা, সীমান্তের ভিড়ের ওপর নির্ভর করে। ছুটির মৌসুমে আরও বেশি লাগতে পারে।
মৈত্রী এক্সপ্রেস কি এখন চলছে?
২০২৪ সালের জুলাই থেকে বন্ধ ছিল। আবার চালুর আলোচনা চলছে, যাত্রার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ ঘোষণা দেখে নিন।
ভিসায় বিমানপথ লেখা থাকলে কি বাসে যাওয়া যাবে?
বিজ্ঞাপন
না। ভিসায় যে পথ উল্লেখ আছে, সেই পথেই প্রবেশ করতে হবে। আবেদনের সময় সঠিক পথ বেছে নিন।
শিশুদের কি ভ্রমণ কর দিতে হয়?
নির্দিষ্ট বয়সের নিচের শিশুদের ছাড় বা কম হারের নিয়ম আছে। বয়সসীমা স্থলবন্দরের ব্যাংক বুথ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।