ওসমানীয় সাম্রাজ্যের প্রসারে ঐতিহাসিক নাম ওরহান গাজী—তৃতীয় পর্ব
নিকিয়া শহর দখল ও জেনিচারি বাহিনী গঠনের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের ভিত্তি মজবুত করেন সুলতান ওরহান গাজী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
ওরহান বে তাঁর শাসনকালের শুরুতেই একটি নিয়মিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর বাবা ওসমান গাজীর আমলের শেষদিকে ওসমানীয় রাষ্ট্রে ১০ থেকে ১২ হাজার সৈন্য ছিল এবং সিংহাসনে বসার পর থেকে ওরহান সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করেন। আলাউদ্দিন পাশার পরামর্শে ওরহানই প্রথম জেনিচারি বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেন।
বিজ্ঞাপন
এই বাহিনী মূলত ওসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানীতে প্রাসাদের পাশেই বসবাস করত এবং রাজধানী সুরক্ষায় দক্ষতার সঙ্গে শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা করত। ছোট থেকে নিয়মতান্ত্রিকতা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে কঠোর প্রশিক্ষণে তাদের দক্ষ সৈন্য হিসেবে গড়ে তোলা হতো। জেনিচারি বাহিনী গঠনের জন্য মূলত বলকান অঞ্চলগুলোয় দাস হিসেবে বিক্রি করা খ্রিষ্টান ছেলেশিশুদের বাছাই করা হতো, যদিও কিছু সূত্রে অনাথ খ্রিষ্টান ছেলেশিশুদেরও বাছাই করার কথা উঠে এসেছে।
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর শৃঙ্খলার সঙ্গে বেড়ে ওঠা এসব সৈন্যরা যোগ্যতার ভিত্তিতে সর্বনিম্ন পদ থেকে সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক উচ্চ পদে যেতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিকাংশ উজিরই এসেছিলেন জেনিচারি বাহিনী থেকে। প্রথম দিকে সংখ্যা কম হলেও আলাউদ্দিন পাশার এমন উদ্যোগে জেনিচারি বাহিনী পরবর্তী সুলতানদের আমলে সাম্রাজ্যকে ব্যাপকভাবে উপকৃত করেছিল।
ওরহান গাজী ১৩২৮ সালে রোমান সাম্রাজ্যের তৎকালীন রাজধানী নিকিয়া শহর (বর্তমানে ইজনিক) অবরোধের উদ্যোগ নেন। তিনি প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে নিকিয়া অবরোধ করেন এবং অবরোধ চলাকালে আশেপাশে রোমান বাহিনীর সঙ্গে কয়েকটি ছোট সংঘাতও হয়। রোমান বাহিনী পরাস্ত হয়ে পিছু হটে যায় এবং এক বছরের মধ্যেই নিকিয়ার সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্যের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই খবর পেয়ে রোমান সম্রাট তৃতীয় আন্দ্রেনিকোস রাগান্বিত হয়ে ৪ হাজার দক্ষ রোমান সৈন্য নিয়ে কনস্টান্টিনোপোল থেকে নিকিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকেন। রোমান সম্রাটের সেনাপতি হিসেবে ছিলেন কান্তাকুজেনাস। ১৩২৯ সালের ১০ জুন, বিথিনিয়ার কাছে রোমান সম্রাট তাঁর ৪ হাজার সৈন্য নিয়ে ওরহানের ৮ হাজার সৈন্যের মুখোমুখি হন, যা ইতিহাসে ‘পেলেকাননের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
শক্ত বর্ম পরিহিত রোমান বাহিনীর সামনে হালকা বর্ম পরিহিত ওসমানীয় বাহিনী সংখ্যায় বেশি হলেও, ওরহানের জন্য এ যুদ্ধ বেশ রক্তক্ষয়ী ছিল। যুদ্ধের শুরুতে ওরহান ৩০০ জন অশ্বারোহী তিরন্দাজ পাঠিয়ে পাহাড়ের পাদদেশ থেকে আক্রমণ করেন, যাতে রোমান বাহিনীকে পাহাড়ের দিকে অগ্রসর করিয়ে ফাঁদে ফেলা যায়। তবে কৌশলটি সফল হয়নি এবং রোমান বাহিনী পাহাড়ের দিকে না গিয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ওসমানীয় বাহিনী যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরাজয় নিশ্চিত বুঝে রোমান বাহিনী রাত হওয়ার আগেই পিছু হটা শুরু করলে, ওরহানের নির্দেশে ওসমানীয় বাহিনী রাতেও আক্রমণ অব্যাহত রাখে। একপর্যায়ে রোমান সম্রাট ও তাঁর সেনাপতি আহত হন এবং রাতের মধ্যেই রোমান বাহিনী পালাতে থাকে।
পরদিন সকাল হতেই যুদ্ধের ময়দানে জীবিত কোনো রোমান সৈন্য দেখা যায়নি। কিছু সূত্র অনুযায়ী, রোমান সম্রাট আগের রাতেই গুটি কয়েক সৈন্য নিয়ে পালিয়ে যান এবং সেনাপতি কান্তাকুজেনাস বেঁচে থাকা সৈন্যদের নিয়ে ভোর হওয়ার আগেই সমুদ্রপথে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান। ফলে পেলেকানন প্রান্তরের এ যুদ্ধে রোমানদের বিরুদ্ধে ওরহানের নেতৃত্বে ওসমানীয় বাহিনীর বিজয় হয়।
ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এ যুদ্ধ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ স্বয়ং একজন রোমান সম্রাট পরাজিত হয়েছিলেন ওসমানীয় সুলতানের কাছে। রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসে এটি একটি কলঙ্কিত অধ্যায় এবং ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বড় বিজয়গুলোর মধ্যে অন্যতম। যুদ্ধের পর ওরহান নিকিয়া শহরকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে তীব্র অবরোধের নির্দেশ দেন।
নিকিয়া লেকের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারায় অবরোধ দীর্ঘায়িত হয়। দুই বছর পর ১৩৩১ সালে দুর্ভিক্ষ আসন্ন দেখে নিকিয়ার জনগণ ও সৈন্যরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। রোমান সম্রাট নিকিয়া রক্ষায় নতুন কোনো সহায়তা না দেওয়ায়, ১৩৩১ সালের ২ মার্চ নিকিয়া শহর ওরহানের নিকট সমর্পণ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
ওরহান কোনো প্রতিরোধের মুখে না পড়েই শহরে ঢুকে পড়েন। এ সময় রোমান গভর্নর ও তাঁর ২ হাজার রোমান সৈন্য আত্মসমর্পণ করলে, ওরহান তাঁদের নিকিয়া থেকে নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন।