ডিসেম্বর নিয়ে মন্তব্যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নেই: উপদেষ্টা তিতুমীর
ডিসেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের ফিরে আসা নিয়ে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, এখন আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো কেউ নেই, যেমনটি ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ে দেখা গিয়েছিল। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মানুষের হাতে আওয়ামী লীগের বিদায়কে তিনি দেশের বিজয় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিজ্ঞাপন
রোববার বিকেলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মনসুন থিয়েটার হলে ‘চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ: স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা সেমিনার সিরিজের পঞ্চম পর্ব হিসেবে এই আলোচনার আয়োজন করেছিল জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘যদি কেউ বলে, “ডিসেম্বর দরজায়” কড়া নাড়ছে, তাহলে বুঝতে হবে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের মাটির, বাংলাদেশের ঘাসের, বাংলাদেশের পানির কোনো সম্পর্ক নেই।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের এই অধ্যাপক আরও বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে শুধুমাত্র খাদ্যসংকট বা বাজারব্যবস্থার ব্যর্থতা ছিল না, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের বিচ্ছিন্নতা ও ক্ষমতার বৈধতার সংকট ছিল অন্যতম কারণ।
উপদেষ্টা বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনপদ্ধতির মিল রয়েছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি ও সহিংসতার মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা উভয় সময়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে খাদ্যের প্রাপ্যতা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও সামাজিক চুক্তির অনুপস্থিতিসহ ভূরাজনীতির প্রভাব থাকলেও রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের সংকটটি মূল জায়গা।
সেমিনারে তিনি জানান, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল না এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে জনগণের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই সময়ে গ্রাম থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যার প্রভাব রেশন ও খাদ্যবণ্টনব্যবস্থাতেও ছিল। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের মতো ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালেও বিরোধীদের দমন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রবণতা দেখা গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দামের প্রসঙ্গ টেনে উপদেষ্টা বলেন, ১৯৭২ সালে প্রতি টন চালের আন্তর্জাতিক দাম ১৪৭ ডলার থাকলেও ১৯৭৪ সালে তা বেড়ে ৫৪২ ডলারে দাঁড়ায়। সেই সময়েও বাংলাদেশের বাজারে চালের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি ছিল বলে তিনি জানান। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে জনগণের বিজয় হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১, ১৯৭৫, ১৯৯০ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মানুষ তাদের সার্বভৌমত্ব ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই করেছে।
তিনি আরও বলেন, এই বিজয় ধরে রাখতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা জরুরি। জাতীয় সংসদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বৈধ সহিংসতার একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকতে হবে, তবে তা জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের যে স্বীকৃতি রয়েছে, তা কার্যকর সংসদ ছাড়া প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র যখন জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সহিংসতার আশ্রয় নেয়, তখন দুর্ভিক্ষ ও লুটপাটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক এহ্সান মাহমুদ। এতে আরও বক্তব্য রাখেন লেখক ও পানাম ইনস্টিটিউটের কোষাধ্যক্ষ আসিফ ইকবাল এবং অর্থনীতিবিদ ও গবেষক নাহিয়ান বিন খালেদ।