মহাসমাবেশে যাওয়ার পথে গ্রাম পুলিশ প্রধানের মৃত্যু
বেতন বৃদ্ধির ঘোষণার দিনই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন রংপুরের জামশেদ আলী
রংপুর জেলা প্রতিনিধি · বদরগঞ্জ, রংপুর
প্রকাশ:
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ প্রধান (দফাদার) জামশেদ আলী ঢাকায় গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মহাসমাবেশে যোগ দিতে গিয়ে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। শনিবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মহাসমাবেশস্থলের প্রবেশমুখে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সেখানে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞাপন
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্য কবি সাগর জানান, বদরগঞ্জ উপজেলার ৮৪ জন গ্রাম পুলিশ সদস্য দুটি বাসে করে ঢাকায় এসেছিলেন। মহাসমাবেশে প্রবেশের সময় ভিড়ের মধ্যে জামশেদ আলী কিছুটা পেছনে পড়ে যান। তিনি বলেন, 'মহাসমাবেশে যোগদান করতে আমরা বদরগঞ্জ উপজেলার ৮৪ জন গ্রাম পুলিশ সদস্য দুটি বাসে করে ঢাকায় গিয়েছিলাম। জামশেদ আলী আমার সঙ্গেই ছিল। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মহাসমাবেশস্থলে প্রবেশের সময় আমি ছিলাম সামনে। ভিড়ে কিছুটা পেছনে পড়ে যান জামশেদ আলী। হঠাৎ কেউ একজন বলেন, বাইরে একজন মাটিতে পড়ে আছে। দ্রুত বের হয়ে দেখি, জামশেদ আলী সমাবেশস্থলে প্রবেশের মুখ থেকে ১৫-২০ গজ দূরে পড়ে আছেন। তখন জ্ঞান ছিল না। সেখান থেকে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।'
জামশেদ আলীর ছেলে মো. নুরুজ্জামান (রনি) জানান, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে অন্য গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বদরগঞ্জ থেকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তার বাবা। রাত পৌনে দুইটার দিকে বাসে থাকার সময় ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। নুরুজ্জামান বলেন, 'বাবা, ঘুমাইছ? গ্রামে চোখ-কান খোলা রেখো বাবা।' এছাড়া ঢাকায় যাওয়ার আগে বাবা তাকে এলাকা পাহারা দিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
১৯৯৭ সালে গ্রাম পুলিশে যোগ দেওয়া জামশেদ আলী ১৫ বছর ধরে গ্রাম পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে ছিল তাঁর পরিবার। ছেলে নুরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন রাতে বাবা বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতেন। খাওয়ার সময় বাবা বলতেন, 'বাবা, আমাদের বেতন বাড়বে, তখন আর কোনো সমস্যা হবে না।' আজ রোববার সকাল ১০টার দিকে জানাজা শেষে বদরগঞ্জ উপজেলার কাঁচাবাড়ি সরকারপাড়া গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
মহাসমাবেশে গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়, যেখানে গ্রাম পুলিশ প্রধানের বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাবার মৃত্যুর পর ফেসবুকে নুরুজ্জামান লিখেছেন, 'প্রিয় আব্বা, ...আজকে তো আপনার বেতন বাড়ল, সেই বেতন আর আপনি নিতে পারলেন না। আব্বা, আপনার বেতন আমার লাগবে না, শুধু আপনি হলেই হতো আমার। আব্বা, আপনি কেন আমাকে এতিম করে গেলেন?'
বিজ্ঞাপন
জামশেদ আলীর মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক তিন লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। শনিবার রাতে রংপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী, বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী এবং বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকারসহ স্থানীয় বিএনপি নেতারা এই অনুদানের টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেন। নুরুজ্জামান বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী আমার বাবার মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিক তিন লাখ টাকা অনুদান পাঠিয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। বাবার স্বল্প বেতনে অতিকষ্টে সংসার চলত। আমি চাই, বাবার চাকরিটা যেন আমাকে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী যেন আমাদের পরিবারের প্রতি নজর রাখেন।'