ভ্রমণ কর পরিশোধের নিয়ম: স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে ট্রাভেল ট্যাক্স
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বেনাপোল বা বুড়িমারী সীমান্তে প্রথমবার গিয়ে অনেকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারেন, পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াও আরেকটা কাগজ লাগবে: ভ্রমণ করের রসিদ। এটি না থাকলে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পার হওয়া যায় না। অথচ কাজটা ঘরে বসেই আগে সেরে রাখা যায়, তাতে সীমান্তে সময় বাঁচে।
বিজ্ঞাপন
ভ্রমণ কর হলো বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার সময় সরকারকে দেওয়া একটি কর, যা ভ্রমণ কর আইনের অধীনে আদায় করা হয়। স্থলপথ বা নৌপথে বিদেশ গেলে বর্তমানে যাত্রীপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা ভ্রমণ কর দিতে হয়। আকাশপথে গেলে গন্তব্যভেদে আলাদা হার আছে, তবে তা সাধারণত বিমান টিকিটের দামের মধ্যেই ধরা থাকে, আলাদা করে দিতে হয় না।
করের হার জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে মাঝে মাঝে বদলায়। তাই এখানে দেওয়া অঙ্কগুলো আনুমানিক ধারণা হিসেবে নিন এবং যাত্রার আগে স্থলবন্দরের ব্যাংক বুথ বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপন থেকে নিশ্চিত হোন।
ভ্রমণ কর কত
১. স্থলপথ ও নৌপথে: সাম্প্রতিক বাজেটে স্থল ও নৌপথে বিদেশগামী যাত্রীর ভ্রমণ কর পাঁচশ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করা হয়েছে। ভারত, নেপাল বা ভুটানে সড়কপথে গেলে এই হারই প্রযোজ্য।
বিজ্ঞাপন
২. আকাশপথে: সার্কভুক্ত দেশ, মধ্যপ্রাচ্য আর অন্যান্য দেশের জন্য আলাদা হার নির্ধারিত, সাধারণত কয়েক হাজার টাকার মধ্যে। দূরের গন্তব্যে হার বেশি। এই কর টিকিটের মোট দামের সঙ্গে যুক্ত থাকে, টিকিটের কর-বিবরণে আলাদা করে দেখা যায়।
৩. অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট: সাম্প্রতিক নিয়মে দেশের ভেতরের ফ্লাইটেও সামান্য অঙ্কের ভ্রমণ কর যুক্ত হয়েছে, যা টিকিটের দামের মধ্যেই থাকে।
৪. বন্দর ফি আলাদা: স্থলবন্দর দিয়ে গেলে ভ্রমণ করের বাইরে বন্দর কর্তৃপক্ষের যাত্রীসেবা ফি বা পোর্ট ফি দিতে হয়, যা সাধারণত পঞ্চাশ টাকার আশপাশে। এটি ভ্রমণ কর নয়, আলাদা রসিদে দিতে হয়।
ভারত ভ্রমণ ট্যাক্স: স্থলবন্দরে কীভাবে দেবেন
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশি যাত্রীদের সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ কর দিতে হয় ভারত যাওয়ার সময়, বেনাপোল, বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা, আখাউড়া, তামাবিল বা দর্শনার মতো স্থলবন্দরে।
১. সোনালী ব্যাংকের বুথে: প্রায় সব বড় স্থলবন্দরে সোনালী ব্যাংকের বুথ থাকে। পাসপোর্ট দেখিয়ে নগদ টাকা দিলে রসিদ দেওয়া হয়। ভিড়ের সময় এখানে লম্বা লাইন হয়।
২. রসিদ যাচাই: রসিদে নিজের নাম, পাসপোর্ট নম্বর ও টাকার অঙ্ক ঠিক আছে কি না দেখে নিন। ভুল থাকলে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করান।
৩. ইমিগ্রেশনে জমা: বহির্গমন ইমিগ্রেশনে পাসপোর্টের সঙ্গে রসিদ দেখাতে হয়।
বিজ্ঞাপন
৪. বন্দর ফি: আলাদা কাউন্টারে বা অনলাইনে বন্দর কর্তৃপক্ষের ফি দিতে হয়। বেনাপোলে ভোগান্তি কমাতে এই ফিও অনলাইনে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে বলে জানা যায়।
সকালের দিকে সীমান্তে পৌঁছালে ব্যাংক বুথে ভিড় কম থাকে। তবু সবচেয়ে ভালো উপায় হলো যাত্রার আগেই অনলাইনে কর দিয়ে রসিদ প্রিন্ট করে নেওয়া।
ট্রাভেল ট্যাক্স অনলাইনে পরিশোধ
সোনালী ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই স্থলপথের ভ্রমণ কর দেওয়া যায়। সাধারণ ধাপগুলো এমন, যদিও মেনুর নাম সময়ে সময়ে বদলাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
১. সেবা বাছাই: সোনালী ব্যাংকের অনলাইন পেমেন্ট সেবায় গিয়ে সরকারি ফি বা কর পরিশোধের অংশ থেকে ভ্রমণ কর বেছে নিন।
২. তথ্য পূরণ: পাসপোর্টে যেভাবে আছে, ঠিক সেভাবে নাম, পাসপোর্ট নম্বর, মোবাইল নম্বর আর কোন বন্দর দিয়ে যাবেন তা দিন।
৩. পরিশোধ: ব্যাংক কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা যে মাধ্যমগুলো দেওয়া থাকে, তার একটি দিয়ে টাকা দিন। সেবা চার্জ যুক্ত হতে পারে।
৪. রসিদ প্রিন্ট: পরিশোধের পর তৈরি হওয়া চালান বা রসিদ ডাউনলোড করে প্রিন্ট করুন। মোবাইলে পিডিএফও রেখে দিন।
বিজ্ঞাপন
একাধিক যাত্রীর জন্য প্রত্যেকের আলাদা রসিদ লাগবে। পরিবারের সবার জন্য একসঙ্গে দিলেও প্রত্যেকের পাসপোর্ট নম্বর অনুযায়ী আলাদা চালান নিশ্চিত করুন।
বিমানবন্দরে ভ্রমণ কর
বিমানে গেলে সাধারণত আলাদা কিছু করতে হয় না। টিকিট কেনার সময় এয়ারলাইনস বা ট্রাভেল এজেন্সি ভ্রমণ করসহ মোট দাম নেয়। টিকিটের ভাড়ার বিবরণে কর ও ফির তালিকা থাকে, সেখানে বাংলাদেশের ভ্রমণ কর অন্তর্ভুক্ত থাকে।
যাঁরা ভ্রমণ কর থেকে ছাড় পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের টিকিট কেনার সময়ই এয়ারলাইনসকে জানাতে হয় এবং প্রমাণ দেখাতে হয়, নইলে কর কেটে নেওয়া হয়। পরে ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল।
বিজ্ঞাপন
কারা ছাড় পান
আইন ও প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কিছু শ্রেণির যাত্রী ভ্রমণ কর থেকে পুরো বা আংশিক ছাড় পান। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সের নিচের শিশু, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, ক্যানসার রোগী, স্ট্রেচারে বহন করা রোগী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ছাড় পান, আর একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে অর্ধেক হারের নিয়ম আছে বলে জানা যায়। কূটনীতিক ও কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারাও ছাড়ের আওতায় থাকেন।
ছাড় পেতে প্রমাণ দেখাতে হয়, যেমন শিশুর জন্মনিবন্ধন বা পাসপোর্টে জন্মতারিখ, রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সনদ, প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রে সরকারি পরিচয়পত্র। বয়সসীমা ও শ্রেণি নিয়ে সংশয় থাকলে ব্যাংক বুথে জিজ্ঞেস করুন।
একটি উদাহরণ: চার সদস্যের পরিবার স্থলপথে ভারতে
বিজ্ঞাপন
ধরা যাক, বাবা-মা, বারো বছরের এক সন্তান আর চার বছরের এক শিশু বেনাপোল দিয়ে কলকাতা যাচ্ছেন। প্রাপ্তবয়স্ক দুজনের প্রত্যেকের জন্য পূর্ণ হারে ভ্রমণ কর, বর্তমানে প্রায় এক হাজার টাকা করে। বড় সন্তানের ক্ষেত্রে বয়সভেদে অর্ধেক হার প্রযোজ্য হতে পারে, আর ছোট শিশুটি ছাড়ের আওতায় পড়তে পারে। তবে এই বয়সসীমা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত, তাই ব্যাংক বুথে শিশুদের পাসপোর্ট দেখিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন।
এর বাইরে প্রত্যেক যাত্রীর জন্য বন্দরের সেবা ফি আলাদা দিতে হতে পারে। সব মিলিয়ে পরিবারটির ভ্রমণ কর ও বন্দর ফি বাবদ মোটামুটি আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার মধ্যে খরচ হবে বলে আনুমানিক ধরা যায়। প্রত্যেক সদস্যের নামে আলাদা রসিদ নিন এবং রসিদগুলো পাসপোর্টের সঙ্গে একসঙ্গে রাখুন, যাতে ইমিগ্রেশনে দ্রুত দেখাতে পারেন।
যে ভুলগুলো সাধারণত হয়
১. নামের বানানে ভুল: অনলাইনে কর দেওয়ার সময় পাসপোর্টের সঙ্গে নাম না মিললে সীমান্তে সমস্যা হয়।
বিজ্ঞাপন
২. বন্দর ফি ভুলে যাওয়া: ভ্রমণ কর দিয়েই অনেকে নিশ্চিন্ত হন, কিন্তু বন্দর ফি আলাদা, তা না দিলে আটকে যেতে হয়।
৩. দালালের হাতে টাকা: সীমান্তে কেউ দ্রুত কাজ করে দেওয়ার কথা বলে বেশি টাকা চাইতে পারে। নিজে ব্যাংক বুথ বা অনলাইনে দিন, সরকারি রসিদ নিন।
৪. রসিদ হারানো: রসিদের কপি ও মোবাইলে ছবি রাখুন।
৫. পুরোনো হার ধরে নেওয়া: বাজেটের পর হার বদলাতে পারে। যাত্রার আগে বর্তমান হার জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভ্রমণ কর কত, ভারত যেতে স্থলপথে?
সাম্প্রতিক নিয়মে প্রায় এক হাজার টাকা, সঙ্গে বন্দরের সামান্য সেবা ফি। হার বাজেটের মাধ্যমে বদলাতে পারে, যাত্রার আগে নিশ্চিত হোন।
বিমানে গেলে কি আলাদা করে ভ্রমণ কর দিতে হয়?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত না। বিমান টিকিটের দামের মধ্যেই ভ্রমণ কর অন্তর্ভুক্ত থাকে। টিকিটের কর-বিবরণে তা দেখা যায়।
অনলাইনে দেওয়া ভ্রমণ কর কি সব স্থলবন্দরে গ্রহণযোগ্য?
সাধারণত হ্যাঁ, সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া রসিদ সব বন্দরে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা। তবে রসিদে উল্লেখিত বন্দর ও তথ্য ঠিক রাখুন।
ফেরার সময় কি আবার ভ্রমণ কর দিতে হয়?
বিজ্ঞাপন
না। ভ্রমণ কর শুধু বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার সময় দিতে হয়, ফেরার সময় নয়।