অনলাইনে নামজারি আবেদন করার নিয়ম: ই-নামজারির কাগজপত্র ও ধাপ
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
জমি কিনে দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন, ভাবছেন কাজ শেষ। আসলে অর্ধেক কাজ বাকি। সরকারি রেকর্ডে, অর্থাৎ খতিয়ানে, জমির মালিক হিসেবে এখনো আগের মালিকের নামই রয়ে গেছে। এই রেকর্ড হালনাগাদ করে নিজের নামে নতুন খতিয়ান খোলার প্রক্রিয়াকেই বলে নামজারি, অনেক এলাকায় যাকে খারিজও বলা হয়। নামজারি ছাড়া ভূমি উন্নয়ন কর নিজের নামে দেওয়া যায় না, জমি বিক্রি, ব্যাংক ঋণ বা ভাগবণ্টনেও জটিলতা তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
একসময় এই কাজের জন্য ভূমি অফিসে দিনের পর দিন ঘুরতে হতো। এখন অনলাইনে নামজারি আবেদন করা যায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি ব্যবস্থায়, যা mutation.land.gov.bd ঠিকানায় এবং মন্ত্রণালয়ের ভূমি সেবা পোর্টাল ও অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া যায়। আবেদন ফরম পূরণ, কাগজ আপলোড ও ফি পরিশোধ, সবই অনলাইনে হয়। এরপর সহকারী কমিশনার ভূমি বা এসি ল্যান্ড অফিস আবেদন যাচাই, শুনানি ও অনুমোদন সম্পন্ন করে।
নিচে কারা কখন আবেদন করবেন, কী কী কাগজ লাগবে, কত ফি এবং আবেদনের পর কী ঘটে, ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
কখন নামজারি করতে হয়
১. জমি কেনার পর: সাফকবলা বা অন্য দলিলের মাধ্যমে জমি কিনলে।
বিজ্ঞাপন
২. উত্তরাধিকার: মা-বাবা বা অন্য কারও মৃত্যুর পর ওয়ারিশ হিসেবে জমির মালিক হলে।
৩. দান বা হেবা: দানপত্র বা হেবার মাধ্যমে জমি পেলে।
৪. বণ্টন: শরিকদের মধ্যে বণ্টননামার মাধ্যমে জমি ভাগ হলে।
৫. আদালতের রায় বা নিলাম: আদালতের ডিক্রি বা সরকারি নিলামে জমি পেলে।
বিজ্ঞাপন
ই নামজারি আবেদনে যেসব কাগজ লাগে
আবেদনের আগে নিচের কাগজগুলোর পরিষ্কার স্ক্যান বা ছবি প্রস্তুত রাখুন। সব ক্ষেত্রে সব কাগজ লাগে না, জমি পাওয়ার ধরন অনুযায়ী কিছু কাগজ যোগ বা বাদ হয়।
১. আবেদনকারীর ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র: একাধিক আবেদনকারী হলে সবার।
২. দলিল: যে দলিলের মাধ্যমে জমির মালিক হয়েছেন, তার কপি বা সার্টিফায়েড কপি।
বিজ্ঞাপন
৩. পূর্ববর্তী খতিয়ান: সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান, যেমন বিএস, আরএস, এসএ বা সিএস, যা প্রযোজ্য।
৪. বায়া দলিল: বিক্রেতা কীভাবে মালিক হয়েছিলেন, তার প্রমাণ হিসেবে আগের দলিল।
৫. ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ: হালনাগাদ খাজনা পরিশোধের দাখিলা। ভূমি উন্নয়ন কর এখন ldtax.gov.bd-তে অনলাইনেও দেওয়া যায়।
৬. ওয়ারিশ সনদ: উত্তরাধিকারসূত্রে আবেদনে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের দেওয়া ওয়ারিশ সনদ, প্রয়োজনে মৃত্যুসনদ ও বণ্টননামা।
বিজ্ঞাপন
৭. অন্যান্য: আমমোক্তারনামা, আদালতের রায় বা ডিক্রির কপি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
অনলাইনে নামজারি আবেদন করার নিয়ম: ধাপে ধাপে
পোর্টালের নকশা ও মেনুর নাম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তবে মূল ধাপগুলো এ রকম।
১. পোর্টালে ঢুকুন: ই-নামজারির পোর্টাল বা ভূমি সেবার অ্যাপ খুলে নামজারি আবেদনের বিকল্প বেছে নিন। মোবাইল নম্বর ও এনআইডি দিয়ে নিবন্ধন বা লগইন করতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
২. জমির অবস্থান: বিভাগ, জেলা, উপজেলা বা সার্কেল এবং মৌজা নির্বাচন করুন।
৩. খতিয়ান ও দাগের তথ্য: পূর্ববর্তী খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং প্রতিটি দাগে আপনার জমির পরিমাণ লিখুন। কাগজের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে লিখুন।
৪. আবেদনকারী ও আগের মালিকের তথ্য: নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম, ঠিকানা এবং যাঁর কাছ থেকে জমি পেয়েছেন, তাঁর তথ্য দিন।
৫. কাগজ আপলোড: প্রস্তুত রাখা কাগজগুলো নির্দিষ্ট ঘরে আপলোড করুন।
বিজ্ঞাপন
৬. ফি পরিশোধ ও জমা: আবেদন ও নোটিশ জারির ফি অনলাইনে মোবাইল আর্থিক সেবা, কার্ড বা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করে আবেদন জমা দিন। আবেদনের নম্বর লিখে রাখুন।
খরচ কত
সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়া নামজারিতে আর কোনো খরচ নেই। প্রচলিত হিসাবে আবেদনের সময় কোর্ট ফি বাবদ ২০ টাকা ও নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা দিতে হয়। আবেদন অনুমোদনের পর রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা এবং খতিয়ানের প্রত্যায়িত কপির ফি ১০০ টাকা, অর্থাৎ ডিসিআর বাবদ ১,১০০ টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা। ফি কখনো পরিবর্তিত হলে পোর্টালে দেখানো অঙ্কই চূড়ান্ত। কেউ এর বাইরে টাকা চাইলে তা অবৈধ।
আবেদনের পর কী হয়
বিজ্ঞাপন
আবেদন জমা হলে তা যায় সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড অফিসে। সেখান থেকে ইউনিয়ন বা পৌর ভূমি অফিসে সরেজমিন তদন্ত ও প্রতিবেদনের জন্য পাঠানো হয়। এরপর আবেদনকারী ও সংশ্লিষ্টদের শুনানির তারিখ জানিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়, যা মোবাইলে এসএমএসেও আসে। শুনানির দিন মূল কাগজপত্র নিয়ে হাজির থাকুন। শুনানিতে আপত্তি না থাকলে আবেদন মঞ্জুর হয়। এরপর ডিসিআর ফি পরিশোধ করলে আপনার নামে নতুন খতিয়ান তৈরি হয় এবং ডিসিআর ও খতিয়ানের কপি অনলাইনে পাওয়া যায়।
নিয়ম অনুযায়ী নামজারি নির্দিষ্ট কর্মদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা, যা সাধারণত আঠাশ কর্মদিবস হিসেবে প্রচলিত। তবে আপত্তি, কাগজের ঘাটতি বা মামলা থাকলে সময় বেশি লাগে। আবেদনের অবস্থা আবেদন নম্বর দিয়ে পোর্টালে দেখা যায়।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি জটিলতা দেখা দেয় ওয়ারিশদের নামজারিতে। এ ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশ মিলে একসঙ্গে আবেদন করা ভালো, অথবা আগে আপসে বণ্টননামা দলিল করে প্রত্যেকে নিজের অংশের জন্য আলাদা নামজারি করতে পারেন। ওয়ারিশ সনদে সব উত্তরাধিকারীর নাম সঠিকভাবে থাকা জরুরি। কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে পরে তিনি আপত্তি করতে পারেন এবং পুরো প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে। প্রবাসী ভাই-বোন থাকলে তাঁদের পক্ষে বৈধ আমমোক্তারনামা তৈরি করে রাখুন, যাতে শুনানিতে প্রতিনিধিত্ব করা যায়।
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে খারিজের আবেদন করার নিয়ম: সতর্কতা
১. দালাল এড়িয়ে চলুন: নিজে আবেদন করুন বা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের সহায়তা নিন। কেউ দ্রুত করে দেওয়ার নামে বাড়তি টাকা চাইলে দেবেন না।
২. তথ্যে অমিল নয়: দলিল, খতিয়ান ও এনআইডিতে নামের বানানে অমিল থাকলে শুনানিতে জটিলতা হয়। আগে থেকে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নিন।
৩. খাজনা হালনাগাদ রাখুন: বকেয়া ভূমি উন্নয়ন কর থাকলে আবেদন আটকে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৪. শুনানির নোটিশ খেয়াল করুন: মোবাইল নম্বর সচল রাখুন, শুনানিতে অনুপস্থিত থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
৫. সহায়তা: ভূমি সেবা-সংক্রান্ত তথ্য বা অভিযোগের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টার ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নামজারি না করলে কী সমস্যা হয়?
বিজ্ঞাপন
রেকর্ডে আগের মালিকের নাম থেকে যায়। ফলে খাজনা দেওয়া, জমি বিক্রি, ঋণ নেওয়া বা মামলায় মালিকানা প্রমাণে জটিলতা হয়।
অন্যের হয়ে কি অনলাইনে আবেদন করা যায়?
হ্যাঁ, প্রতিনিধি আবেদন জমা দিতে পারেন, তবে আবেদনকারী হবেন জমির প্রকৃত মালিক এবং তাঁর কাগজই দিতে হবে। শুনানিতে মালিকের উপস্থিতি বা বৈধ প্রতিনিধিত্ব লাগে।
আবেদন নামঞ্জুর হলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
নামঞ্জুরের কারণ দেখে কাগজের ঘাটতি পূরণ করে নতুন করে আবেদন করা যায়। আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিলের সুযোগ আছে।
ডিসিআর কী?
ডিসিআর হলো নামজারির ফি পরিশোধের রসিদ। এটি এবং নতুন খতিয়ান, দুটোই যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।